নদীতে জোসনার বসতবাড়ি ভাঙ্গন

বৃহস্পতিবার, আগস্ট 19, 2021

আমরা আজ তুলে এনেছি জোসনা ও হানিফ শেখ এর গল্প। যারা নদীতে সব কিছু হারিয়ে খুবই কষ্টে আছেন। জোসনা তার স্বামী হানিফ শেখ সহ ফরিদপুর জেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের শুকুর আলী মৃধার ডাংগীতে প্রায় ১৮ বছর ধরে বসবাস করছেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলে সহ ৫ জনের সংসার। হানিফ শেখ পেশায় একজন কৃষক। প্রায় ২৫ বছর আগে একই ইউনিয়নের পাঙ্গাসের চর নামক স্থানে নিজস্ব জমিতে বসবাস করতেন তারা। প্রায় পাঁচ বার নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে নিজস্ব জমি, বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ২০ বছর পূর্বে অন্যের ৫০ শতক জমি আর হাড়ি পাতিল নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে এই এলাকায় চলে আসেন হানিফ শেখ। ছোট্ট একটা কুড়ে ঘর তৈরি করেন এবং শুকুর আলী মৃধা ডাঙ্গিতে বসবাস শুরু করেন।

হানিফ শেখ এর মত পাঙ্গাসের চড়ে বসবাসকারী অনেকের একই পরিস্থিতি। নদীগর্ভে সর্বস্ব হারানো তারাও তেমন পড়ালেখা ও কাজ না জানার ফলে নতুন স্থানে এসে অন্যের জমি নিয়ে কৃষি কাজ শুরু করেছেন। বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি অন্যের বাড়ির জমিতে মজুরি খাটেন এইভাবেই বেশিরভাগ মানুষ সংসার চালায়। জোসনার ও এভাবেই অন্য সবার মতো যাচ্চিলো সংসার। এ সময় তাদের সংসার আলো করে পরপর তিনটা ছেলে ও মেয়ে আগমন ঘটে।

সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি একা একা সামলাতে না পারায় স্ত্রী জোসনাও স্বামীর সাথে কৃষিকাজে সাহায্য করেন। জমিতে ফসল লাগানো আগাছা দমন সহ নানা কাজে সহায়তা করেন জোসনা। এভাবে চলতে থাকে এবং একমাত্র ছেলেকে পড়া লেখা শেখার উপযুক্ত হলে স্কুলে পাঠান। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর পড়াশুনার খরচ চালাতে না পারায় ছেলের পড়াশুনা বন্ধ করে দেন। যখন ছেলের বয়স ১২ বছর বাধ্য হন হাতের কাজ শেখানোর জন্য। যদিও শিশু শ্রম নিষিদ্ধ, শিশুর উপরে আয় করবেন এই আশায় বাবা হানিফ শেখ ছেলেকে টাইলস মিস্ত্রির সাথে কাজে পাঠান।

 
জোসনা তার স্বামীর সাথে নদীর তীরবর্তী বাড়ির আঙিনায়

বিগত দুই বছর ধরে ছেলে কাজ করে বাবার সংসারে সহায়তা করছেন। মেয়ে দুইজন প্রাইমারি লেবেলে পর্যন্ত পড়ালেখা করছেন। গেল ২০২০ সালের বন্যায় নদীর কূল ঘেঁষে অনেক ভয়ে ভয়ে বসবাস করতে হয়েছে। এমন একটা পরিস্থিতি হয়েছিল যে পদ্মা নদীর পানি উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ি ঘর ছাড়তে বাধ্য হন। যেহুতু দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ছিল তাই স্থানীয় আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় একমাস থাকতে হয়। এতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন জোসনা ও তার স্বামী। বাড়িঘর সংস্কারসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। এছড়া তাদের কৃষি ফসল নষ্ট হয়ে যায়।

এ বছর মে ২০২১ হতে পদ্মা নদীতে পানি পড়া শুরু হয়েছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী ভাঙ্গন সমানতালে বাড়তে থাকে। হানিফ শেখ এর বাড়ি হতে নদীর পাড়ের দূরত্ব ছিল প্রায় ১৫০ ফুট। মে মাস হতে ২৫ এ জুন ২০২১ পর্যন্ত প্রায় ১৩০ টি নদী তীরবর্তী বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রত্যেকটি পরিবার প্রায় ১০ লাখ টাকার ওপরে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। হানিফ শেখ জোসনা চেষ্টা করছেন নদীতে বিলীন হওয়ার পূর্বে বাড়িঘরে কিছু অংশ দুইটা গরু সাংসারিক জিনিসপত্র নদীর হাত থেকে বাঁচিয়ে অন্যত্র চলে যেতে। অন্যত্র চলে গেলেও প্রায় দেড় লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হবে। হানিফ শেখ অত্র এলাকাতে কৃষি শ্রমিক হিসাবে অন্যের জমি চাষাবাদ করে যা আয় করতেন সেটা দিয়ে মোটামুটি সংসার চলে যেত। এখন তাকে আবার নতুন কাজের সন্ধান করতে হবে।

নদী ভাঙ্গনে আমার আশে পাশের প্রতিবেশীরা অন্যত্র চলে গেছে কিছুদিন পূর্বে। আমিও চলে যাবো, কিন্তু যেসকল পরিবার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে, নিঃস্ব হয়ে, বাড়ি-ঘর ছেড়ে এখন অন্যত্র মানবেতর জীবনযাপন করছে।

জোসনা

জোসনার বাড়ির সামনে নদীর পাড় বরাবর আমেনা খাতুন নামে একজন নারী তার পরিবার সহ বসবাস করতেন। নদী ভাঙ্গনে তাদের বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ায় উক্ত পরিবার নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গেছে আজ প্রায় ১২ দিন হল। এইভাবে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। আরো চারটি পরিবার নদীর তীরেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখনো আছেন তবে তারাও চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করছেন।

হানিফ শেখ হতাশাব্যঞ্জক কণ্ঠে বলেন, মেয়ে দুইটা পড়ালেখা করিয়ে বড় করে তুলতে পারতেন সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। অন্যত্র আশ্রয় ব্যবস্থা হলেও নতুন স্থানে কি কাজ করবেন, কিভাবে আয় করে সংসার ও মেয়েদের পড়ালেখা খরচ চালাবেন, কিভাবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে থাকার মতো একটি ঘর বানাবেন। এমন ভাবনা চিন্তায় দিশেহারা তিনি ও তার স্ত্রী জোসনা। সংসারের এমন ক্ষতির চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তারা। বর্তমানে তেমন কোনো আয় না থাকায় নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার কিনে খেতে পারছেন না। পরিবারের সবাই অপুষ্টিতে ভুগছেন।  

 
গবাদি পশু সহ খুব দ্রুতই তাদের এই স্থান থেকে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে হবে

এই গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা শহরের সাথে একদম বিচ্ছিন্ন। একটি রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে শহরের সাথে যোগাযোগ সরাসরি হবে এমন স্বপ্ন দেখছেন এখনো টিকে থাকা পরিবারগুলো। এছাড়া অত্র এলাকার অধিকাংশ পরিবারের ছেলে মেয়ে পরিবারের অভাব অনটনের কারণে বাল্যবিবাহের শিকার হন। অত্র এলাকায় বসবাস করতেন মোহাম্মদ আলীর পরিবার নদী ভাঙ্গনের ফলে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়েকে অল্প বয়সে বিবাহ করিয়েছেন। সংসার চালাতে হিমশিম খায় তাই বাধ্য হয়ে ১৪ বছর বয়সে দুই মেয়েকে বিবাহ দিতে বাধ্য হন। ছোট মেয়ে যার বয়স এখন ১২ বছর। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সালেহা বেগম মেয়েকে নিয়ে দুঃস্বপ্নে রাতে ঘুমাতে পারেন না। বসতভিটাহীন ভাসমান পরিবারের মেয়েকে কে বিবাহ করবে। কিভাবে মেয়েকে বিবাহ দেবেন, এছাড়া যৌতুকপ্রথা খুব বেশি।  মোহাম্মদ আলী চান মেয়েদের নিরাপদ জীবন যেখানে নারীদের চলাফেরা থাকবে নিরাপদ এবং নারীদের যথাযত সম্মান প্রদান করা হবে।

মন্ত্যব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


মন্তব্যসমুহ