নদী ভাঙ্গন কবলিত হাসিনা বেগমের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

বৃহস্পতিবার, জুলাই 15, 2021

হাসিনা বেগম তার দিন শুরু করেন সূর্যোদয়ের অনেক আগেই। ৬ মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে চরের ছোট দুইটি ঘরে একসাথে বসবাস করেন সবাই।  হাসিনা বেগম জন্মগতভাবে চরের মেয়ে, প্রায় ৩০ বছর পূর্বে বৈবাহিক সূত্রে ঘর বাঁধেন ফেলা খাঁ এর সঙ্গে। বিবাহের সময় তাদের বাড়ি ছিল চৌধুরীহাটের পাশে, হাটের পাশে বাড়ি হওয়ার কারণে হাটে  শাকসবজি অর্থাৎ কাঁচামালের ব্যবসা করতেন ফেলা খাঁ। বিয়ের পাঁচ বছর যেতে না যেতেই তাদের সুখের ঘর বাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়।

দিক বিদিক শুন্য হাসিনা বেগম এবং ফেলা খাঁ ছোট্ট ছেলে মেয়ে নিয়ে নতুন ঠিকানার সন্ধান করতে থাকেন। তারপর থেকে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় ফেলা খাঁয়ের নানার বাড়ি মঈন উদ্দিন ফকিরের কান্দি। 

বর্তমানে ১০ জনের পরিবার নিয়ে ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার ৪ নং চর নাছিরপুর ইউনিয়নের, মঈন উদ্দিন ফকির কান্দিতে হাসিনা বেগম বসবাস করছেন। ফেলা খাঁ ও হাসিনা বেগম তাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে ঘর বাড়ি হারিয়েছেন ঠিকই কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবন সংগ্রাম কখনো থামিয়ে রাখেননি। হাসিনা বেগমের স্বামী আর ব্যবসা না করলেও অন্যের জমি চাষ করে ফসল ফলাতে থাকে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্থানীয় জমি চাষাবাদ করে সেই ফসল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন সেই কষ্টের দিনগুলিতে।

এই সফল্যের গল্প লেখার সময়, হাসিনা বেগমের ঘরের বাইরে বিস্তীর্ণ উঠান, যেখানে বিভিন্ন সবজির গাছ রয়েছে, বাড়ির এক কোনায় আছে পশুপালনের ঘর, যেখানে হাসিনা বেগম তার পশু পালন করে থাকেন। হাসিনা বেগম চরের মেয়ে হওয়ার কারণে সে জানে কিভাবে চড়ে বেঁচে থাকতে হয়। তাই তিনি স্বামীর জমিতে ছেলে-মেয়েসহ নিজে শ্রম দেন, প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা বাড়ির বাইরে এই সব কৃষি কাজে তিনি ব্যায় করেন। কারণ, জমিতে যদি ফসল ভালো হয় তাহলে তাদের সারাবছর ভালোই চলে যায়। ইতিমধ্যে যে টাকা পয়সা জোগাড় করেছিল সেটা খরচ করে বড় মেয়েকে তিনি বিবাহ দিয়েছেন। অন্য ছেলে মেয়েরা আর্থিক কষ্ট এবং কৃষি ক্ষেত দেখাশুনা করতে গিয়ে তেমন লেখাপড়া করতে পারেনি। হাসিনা বেগম জমির কাজের পাশাপাশি গরু ছাগল হাঁস মুরগি পালন করেন। বর্তমানে তার দুটি গরু, সাতটি ছাগল, পাঁচটি হাঁস ও সাতটি মুরগি রয়েছে।

আমরা জানতে চেষ্টা করি প্রকল্প থেকে তিনি কি ধরণের সহযোগিতা পেয়েছিলেন, এর ফলে তার কৃষি কর্মকান্ডে কিধরনের প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন

আমি আগে থেকেই হাঁস-মুরগী পালন করতাম, এমতঅবস্থায় জানতে পারলাম কোনো এক এনজও ছাগল পালন ও হাঁস-মুরগি পালনের ট্রেনিং দিবে। শুনে আমি এগিয়ে যাই প্রাক্টিক্যাল একশন কারিগরি সহযোগিতায় ভার্ক ফরিদপুর কর্তৃক পরিচালিত প্রজেক্ট এর এজেন্ট এর কাছে। তিনি আমাকে বিভিন্ন নিয়ম জানান এবং আমার আগ্রহ গ্ৰুপের সদস্য হতে সহযোগিতা করে।  আমি গ্ৰুপের সক্রিয় সদস্য হিসাবে বিভিন্ন ট্রেনিং এ অংশ নেই।  এই সময় আমি বিশেষত মাচা পদ্দতিতে ছাগল পালনের উপর বেশ কিছু ট্রেনিং করি। এই সকল ট্রেনিং এর জন্য আমি ছাগল পালনে আরো বেশি মনোযোগী হই। এ সময় প্রকল্প থেকে একটি ছাগলের ঘর করতে আমাকে সহযোগিতা করা হয়।  তাতে আমি আরো উৎফুল্ল হই এবং আরো বেশি করে হাঁস-মুরগি পালন করতে চেষ্টা করি। এই মাচা পদ্দতিতে ছাগল পালনের ফলে আমার ছাগলের রোগ ব্যাধি এখন অনেক কমে গেছে।  এই পদ্দতিতে ছাগল পালনের প্রচলন আমাদের এইখানে আগে দেখি নাই। তবে এখন আমাদের দেখা দেখি অনেকেই এই পদ্দতিতে ছাগল পালন করে বেশ লাভ করছে। 

ফ্লাড রেসিলিয়েন্স প্রকল্পের সাথে যুক্ত হওয়ার পরবর্তী অবস্থান

হাসিনা বেগম যখনই প্রকল্প থেকে ছাগল পালনের ঘর পান তখন তাহার ছাগল ছিল আটটি। পরবর্তীতে সঠিক যত্ন ও লালন পালনের জন্য বৃদ্ধি পেয়ে ২২ টিতে দাঁড়ায়।  এর মাঝে তিনি কিছু বাচ্চা ছাগল ও বিক্রি করছেন। মাঝে মাঝে এই বাচ্চা ছাগল বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি অন্য ছাগল এর খাবার খরচ এর ব্যবস্থা করেছেন।  এখন পর্যন্ত (অর্থাৎ ২০২১ সালের জুন মাস) তিনি দশটি ছাগল বিক্রি করেছেন। ছাগল বিক্রি করে পর্যায়ক্রমে টাকা জোগাড় করে স্বামীর কৃষি জমি বৃদ্ধি করেছেন। হাসিনা বেগম আরো বলেন প্রকল্প থেকে শিখিয়ে দেওয়া মাচা পদ্দতিতে ছাগল পালনের ফলে তার ছাগলের রোগ কম হয়েছে তাই তার স্থানীয় পশু চিকিৎসক এর কাছে যেতে হয় নাই। যার ফলে অনেক টাকা এখন তার হাতে থেকে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন সঞ্চিত অর্থ দিয়ে এই বছর বাদাম চাষ করেছেন। এ বছর তিনি প্রায় ২০ মন বাদাম বিক্রি করতে পারবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। পাশাপাশি তার স্বামী ধানের জমির ও চাষ করছেন তা দিয়ে তাদের সারা বছরের খাবার হয়ে যায়। সর্বোপরি হাসিনা বেগম এর পরিবার এখন এলাকার একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবার।

বন্যা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য কথা

হাসিনা বেগম ও ফেলা খাঁ বর্তমানে যেখানে বসবাস করছেন সেই জায়গা তুলনামূলক উঁচু হওয়ার কারণে গত বন্যায় খুব একটা পানি উঠেনি। সামান্য পানিতে পানি আসলেও তাদের স্তানান্তরিতও হতে হয়নি।  তারা চরের আবহাওয়াতে খুব ভালোভাবে মানিয়ে গেছেন তাই তাদের খুব বেশি অসুখ হয় না বলে আমাদের জানান তবে অসুস্থ হলে অনেক দূরে ডাক্তার দেখাতে যেতে হয় এটা তাদের অনেক বড় সমস্যা। বিভিন্ন বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এলাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে তাদের যেকোনো রোগ বা সমস্যায় অনেক দূরে সদরপুরে আসতে হয় এ ছাড়া কোন উপায় নেই।  এছাড়া গরু ছাগল হাঁস মুরগির কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা হলে সচারচর স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তারের আশ্রয় নেন।

হাসিনা বেগমের চাহিদা বেশি না, পাঁচটা অবিবাহিত মেয়েকে ভালো মানুষের সঙ্গে বিবাহ দিতে পারলেই তিনি খুশি। তিনি আরো চান ছাগল, হাঁস মুরগি পালন করে তার স্বামীকে আরো বেশি সহযোগিতা করতে। সর্বশেষে তার আশা আর যেন নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়তে না হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে হাসিনা বেগমের পরিবার বড় হলেও তাদের বর্তমানে অন্ন বস্ত্রের অভাব নেই। নিজের বাড়ি হয়েছে, দুইটি ঘর হয়েছে, নিজেদের বিশুদ্ধ পানির নলকূপ আছে এবং একটি স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাটট্রিন রয়েছে। তিনি ধন্যবাদ দিয়েছেন ফ্লাড রেজিলিয়ান্স প্রকল্পকে তাকে সাবলম্বী করে গড়ে তুলতে।

মন্ত্যব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


মন্তব্যসমুহ