বন্যা সহনশীল প্রকল্পের জন্যই আজ নাসরিন সুলতানার যত পরিবর্তন

শনিবার, মার্চ 6, 2021

আন্তর্জাতিক মহিলা দিবস ২০২১ কে সামনে রেখে, এই ব্লগে আমরা জুরিখ বন্যা সহনশীল প্রকল্পের একজন কমিউনিটি নেত্রীর গল্প তুলে ধরবো, যিনি বন্যা সহনশীল প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা কাজে লাগিয়ে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি শুধুমাত্র নিজে স্বাবলম্বী হয়ে থেমে থাকেননি বরং আশেপাশের মহিলাদের নিয়ে দল গঠনের মাধ্যমে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যা তার নেতৃত্ব প্রদান গুণাবলির বহিঃপ্রকাশ।  

প্রাক্টিক্যাল একশন, বন্যা সহনশীল প্রকল্পের একটি সহযোগী সদস্য প্রতিষ্ঠান। প্রাক্টিক্যাল একশন দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সাল হতে জুরিখ বন্যা সহনশীল প্রকল্পের আওতায় প্রাক্টিক্যাল একশন ফরিদপুর জেলায়, ২টি উপজেলার, ৪টি ইউনিয়ন এর ৪০ হাজার মানুষের জীবন যাপনের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে, জুরিখ বন্যা সহনশীলতা অ্যালায়েন্স এর সাথে কাজ করে যাচ্ছে। জুরিখ বন্যাসহনশীলতা অ্যালায়েন্স একটি বহু-ক্ষেত্রীয় অংশীদারিত্ব। এর মূল লক্ষ্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কমিউনিটির বন্যা-ঝুঁকির প্রতি সহনশীলতা আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর উপায় খোঁজা। যেহুতু প্রাক্টিক্যাল একশন একটি আন্তর্জাতিক বহু ক্ষেত্রীয় প্রতিষ্ঠান সেজন্য এখানে নারী পুরুষ সমতা বিধান যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। ফরিদপুরে বন্যা সহনশীল এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছেন ভার্ক টিম। এখানে নাসরিন সুলতানার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভার্কে কর্মরত ইউনুচ আলী। নাসরিন সুলতানা, ফরিদপুর জেলার, নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের, ইউসুফ মাতব্বরের ডাঙি বন্যা কবলিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। এখন আমরা নাসরিন সুলতানা মুখ থেকেই তার গল্পটি বিস্তারিত শুনবো।

প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত মাচাল পদ্ধতিতে ছাগল পালনের ঘরের সাথে নাসরিন সুলতানা। ছবি : ইউনুচ আলী (ভার্ক)

 

আপনি কিভাবে আমাদের প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পারেন ? 

২০১৮ সালের শেষের দিকে আমি প্রথম এই প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পারি তখন আমাদের এলাকায় মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন সম্পর্কে কারও খুব একটা অভিজ্ঞতা ছিলনা। যেহেতু আমাদের এলাকায় আগে কেউ এই ধরনের মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন করেনি তাই আমার এই বিষয়ে ধারণা খুব কম ছিল। তবে আমি আগে থেকে ছাগল পালন করতাম কিন্তু খুব একটা লাভ হতো না, ছাগলের অসুখ বেশি হতো তাই কিছুটা হতাশাগ্রস্থ ছিলাম সেই সাথে প্রতি বছরের বন্যার সমস্যা তো ছিলই। এরপর আমি এই প্রকল্পের দলের সাথে যুক্ত হই এবং ট্রেনিং এর পাশাপাশি কিছু আর্থিক সহযোগিতা পাই। প্রকল্পের টাকার সাথে আমার কিছু টাকা যোগ করে আমি মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন শুরু করি। প্রথম প্রথম আমার আশেপাশের লোকজন উপহাস করতো তাতে আমি নিজেও কিছুটা দ্বিধায় পড়েছিলাম। কিন্তু আমি নিজেই যখন দেখলাম এই পদ্ধতিতে ছাগল পালনের কারণে আমার ছাগলের রোগ বালাই কম হচ্ছে ছাগলের স্বাস্থ  ভালো হচ্ছে তাই আমি তখন অন্য সবাইকেও এ বিষয়ে জানাতে থাকি। এতে তাদের মাঝেও আগ্রহের তৈরি হয় এবং অনেকেই এই মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনের প্রক্রিয়া দেখতে আমার বাড়িতে আসতে থাকে।

 

নাসরিন সুলতানা আগ্রহীদের তার ছাগল পালন পদ্ধতি বর্ণনা করছেন। ছবি : ইউনুচ আলী (ভার্ক)

 

আপনাদের বাড়িতে কি প্রতিবছরই বন্যার পানি উঠে? পানি উঠলে আগে কি করতেন আর এখন কি করেন ? 

২০১৮ সালের আগে আমার অবস্থা আর্থিকভাবে বেশ দুর্বল ছিল। যেহেতু প্রতিবছরই আমাদের বাড়িতে বন্যার পানি ওঠে তাই বন্যা হলেই আমার জিনিসপত্র অন্য উঁচু বাসায় রেখে আসতে হতো আর না হলে কিছুদিন উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতাম তারপরে বন্যার পানি নেমে গেলে আবার বাড়িতে ফিরতাম। এই প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের জীবন যাপনের মান পরিবর্তন ঘটেছে। প্রকল্প থেকে আমি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছি এবং অনেক কিছু শিখেছি যা আমাকে আমার পরিবারসহ বন্যার সময় ভালো থাকতে সহায়তা করেছে। এই মাচা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এখানে পানি স্পর্শ না করে। বন্যার সময় কিছু শুকনা জিনিস যেমন আলগা চুলা, খড়ি এবং ছাগলের পাশাপাশি কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস এই মাচার উপরে আমরা উঠিয়ে রাখতে পারি এতে আমাদের বেশ সুবিধা হয়েছে।

 

 

আপনার স্বামী কি করেন? তিনি কি আপনার ছাগল পালনের কাজকে সমর্থন করেন ?

আমার স্বামী একজন মাছ বিক্রেতা। প্রথম প্রথম সে আমাকে খুব একটা উৎসাহিত করতো না কিন্তু তার ধারনার পরিবর্তন শুরু হয় ২০২০ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পর থেকে। এইসময় এতদিন বন্যা হলেও আমাদের ছাগলগুলো বেশ ভালো ছিল এবং পরবর্তীতে আমরা এগুলো বিক্রি করে ভালো অর্থ উপার্জন করতে পেরেছি যে কারণে এখন সে আমাকে এই কাজে যথেষ্ট উৎসাহ দেয় এবং আমার বাড়িতে যে আশেপাশের মানুষজন দেখতে আসে তাতে এখন তিনিও মাঝে মাঝে সাহায্য করে আর আগের মত বিরক্ত বোধ করেনা। উনাকে আমি আমাদের ছাগল পালনের পদ্ধতি সম্পর্কে বুঝিয়েছিলাম  এবং তিনি এর উপকারিতা দেখে আশেপাশের মানুষদের কে নিয়ে টিম গঠন করে কাজ করাতে উৎসাহ দেন। তার এমন সহযোগিতার কারণে আমার কাজ করা এখন অনেক সুবিধা হয়েছে যেহেতু বাজারে তিনিই ছাগল নিয়ে বিক্রি করে দেন।

 

আপনি কি মনে করেন পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ও স্বাবলম্বী হওয়া উচিত ?

হ্যাঁ, পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ও স্বাবলম্বী হওয়া উচিত। আগে আমাকে আমার আশেপাশের লোকজন খুব একটা চিনত না। এই প্রজেক্ট এর কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হওয়ার পরে বিভিন্ন কারণে এখন অনেকেই আমাকে চেনে এটা আমার ভালো লাগে যে চরে নিজের একটা পরিচিতি পেয়েছি। তার পাশাপাশি ছাগল বিক্রি করে কিছু টাকা হাতে পাই যা আমি আমার ইচ্ছামতো ছেলে মেয়ের জন্য খরচ করতে পারি। আমি মনেকরি আমার এইরকম কর্মকান্ড দেখে আমার ছেলে মেয়েও উৎসাহ পাচ্ছে এবং তাদের মানসিক বিকাশ ভালো হচ্ছে। 

 

সন্তানের সাথে নাসরিন সুলতানা। ছবি : ইউনুচ আলী (ভার্ক)

 

আপনি নারী দিবস সম্পর্কে কি বলতে চান?

এটা আসলে আমার ভালো করে জানা নেই। তবে নারী পুরুষ সবাই একে অপরকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায় এবং এটা সমাজের জন্য ভালো। সবাই যদি একে অপরের কাজকে ভালো চোখে দেখে, পুরুষরা যদি নারীদেরকে সাবলম্বী হতে সামর্থ করে এতে করে পুরুষদের প্রতি আমাদের সম্মান বেড়ে যায় যে সে আমাকেও সম্মান করছে এবং আমার কাজকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সোমবার ৮ ই মার্চ আন্তর্জাতিক মহিলা দিবস এবং জুরিখ বন্যা সহনশীল জোট, আমাদের সংগঠন এবং সম্প্রদায়ের মহিলা নেত্রীদের নিয়ে দিনটি  উদযাপন করছে। আপনি যদি নারী নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকা আরও অনুপ্রেরণামূলক মহিলাদের কাছ থেকে গল্প শুনতে চান তবে আমাদের অনুসরণ করুন এবং আমাদের অন্যান্য ব্লগগুলি দেখুন।

মন্ত্যব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


মন্তব্যসমুহ